ইরান যে কারণে সিরিয়া হবে না

যে আরব বসন্ত আরবদের জন্য বুমেরাং হয়েছিল, মিসর ও লিবিয়ার সর্বনাশ করেছিল, তা কি এবার পারস্যের বাগিচায় ফুল ফোটাবে? ইরানের সেনাবাহিনী যখন সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেন হয়ে সৌদি-ইসরায়েলের সীমান্তের কাছাকাছি, তখন দ্রব্যমূল্য বাড়ার পচা শামুকেই কি তাদের পা কাটবে? ইরানে কি সরকার পতন ঘটতে যাচ্ছে?

বাস্তবতা সে রকম মনে হয় না। আন্দোলন বলতে যে সুস্পষ্ট দাবি, কর্মসূচি, নেতৃত্ব এবং তার পেছনে জনগণের বড় অংশের দৃশ্যমান সমর্থন লাগে। ইরানের কয়েকটি শহরে চলা মাঝারি জমায়েতের বিক্ষোভ তা বলে না। তারপরও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং জেরুজালেম নিয়ে উত্তেজনার আবহে এটা ইরানের মন ও মনোযোগের ক্ষতি করবে।

ইরানের যা আপদ, আমেরিকার টুইটার প্রেসিডেন্টের কাছে তা মওকা। ইরানি বিক্ষোভকারীদের স্লোগান নির্ঘাত মধুর সংগীত হয়ে বাজছে ট্রাম্প ও তাঁর বন্ধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কানে। মোসাদের সাবেক প্রধান যদিও বলেছিলেন, চুপ করে থাকলেই ইসরায়েলের লাভ বেশি। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকির শান্তিভঙ্গ দেখে চুপ থাকতে পারেননি নেতানিয়াহু। টিভি সংবাদে আসক্ত টুইটারবাজ ট্রাম্পকেই–বা থামাবে কে? নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প ইরানিদের বন্ধু হয়ে বক্তৃতা দিয়েই ফেলেছেন। অথচ এই যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সুবিধার্থে বছরের পর বছর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে তাকে কমজোরি রাখতে চেয়েছে; ইরানিদের সন্ত্রাসী জাতি বলেছে। আজ ইরানিরা যে অর্থনৈতিক চাপের মুখে হয়রান, সেই চাপের জন্যও পশ্চিমাদের অবরোধ চক্রান্তও কম দায়ী নয়। সোজাসুজি বললে, জনগণকে রুটিরুজির টানাটানিতে ফেলে নিজ নিজ শাসকদের বিপক্ষে চালনাই এ ধরনের অবরোধ ও মিডিয়া-মাস্তানির উদ্দেশ্য।

তা ছাড়া ইরানি জনগণের নিশ্চয়ই মনে আছে ১৯৫৩ সালের কথা। মার্কিন সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআইসিক্স অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক সরকারকে সরিয়ে রেজা শাহ পাহলভির মাধ্যমে ইরানের তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে পর্যন্ত ইরানিরা কার্যত মার্কিন কবজায় ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে বাস করছিল। যা-ই ঘটুক, ইরানিরা সেই জায়গায় ফিরতে চায় না।

এখন তাহলে কী ঘটছে এবং জল কোথায় গিয়ে গড়াবে?

ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ভালো হলেও অবরোধ আর অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার শিকার। প্রধান রপ্তানিপণ্য তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় ইরানের আয়ে টান লেগেছে। ওদিকে সিরিয়া, ইয়েমেন আর লেবাননকে সামরিক সাহায্য করতে গিয়ে জনসেবামূলক কাজে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি কমাতে হয়েছে। গত বাজেটে সামাজিক খাতে বরাদ্দ কমিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বরাদ্দ বাড়ানোয়ও ইরানিরা হতাশ হয়। ফলে জিনিসপত্রের দাম চড়া, বেকারত্ব ৩০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই।

প্রথম প্রশ্ন হলো, দিনবদলের আন্দোলন হলে তা সারা দেশেই হবে। অথচ বিক্ষোভ চলছে কেবল পশ্চিম ইরানের শহরগুলোতেই। আর বিক্ষোভকারীর সংখ্যাও ২০০৯ বিক্ষোভের চেয়ে অনেক গুণ কম। সেবার যদি জমায়েত হয় লাখের ঘরে, এবার শত কি হাজারের বেশি না। কিন্তু বিস্ময়কর দ্রুততায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া থেকে সন্দেহ হয়, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পটু শিকারিরা বসে নেই।

বিক্ষোভের শুরু রুহানির প্রধান প্রতিপক্ষের শহরে। ইরানের দ্বিতীয় প্রধান শহর মাসাদ প্রেসিডেন্টের পরাজিত প্রতিপক্ষ ইব্রাহিম রাইসির ঘাঁটি এলাকা। কট্টরপন্থী এই নেতা সেখানকার মেয়র। তাঁর সমর্থকেরাই বিক্ষোভ শুরু করেন বলে অভিযোগ করেছে ইরানের সরকারি সূত্র। পরের বিক্ষোভ দেখা যায় কুর্দিভাষী ও সংখ্যালঘু আরবিভাষী শহর তথা কারামানশাহ ও আভাজের মতো এলাকায়। এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও নাশকতা আগে থেকেই চালু আছে। এর বাইরে দিন যাপনে ক্লান্ত শ্রমিকশ্রেণির লোক, পশ্চিমা জীবনধারায় আসক্ত তরুণ এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরাও তো আছেই। তবে খোদ তেহরানের পরিস্থিতি কিন্তু ততটা গুরুতর নয়।

ইরানের ক্ষমতাসীনদের আরেক প্রতিপক্ষ হলো একটা চিহ্ন #—যাকে বলে হ্যাশট্যাগ। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, টুইটারে এ রকম অজস্র হ্যাশটাগওয়ালা বার্তা ইরানিদের উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন সে দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান আলী শামখানি। তাঁর ভাষায়, ‘অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৭ ভাগ হ্যাশট্যাগ সৌদিদের। সৌদি জনগণ নয়, সৌদি প্রশাসন এসব করাচ্ছে।’ পাশাপাশি তিনি ব্রিটেন, ইসরায়েল ও আমেরিকাকেও দায়ী করেছেন। টেলিগ্রাম নামের মাধ্যমে বোমা বানানোর কৌশল প্রচার করায় সেটাও বন্ধ করা হয়েছে।

এই হ্যাশট্যাগের প্রভাব দেখা গিয়েছিল ‘আরব বসন্ত’ নামক ঘটনাবলিতে। সে সময়ও অনেক অ্যাকাউন্টের উৎস পাওয়া গিয়েছিল ইউরোপ ও আমেরিকায়। আরবি ভাষার জীবিত শ্রেষ্ঠ কবি আদোনিসও গত নভেম্বরে ঢাকার লিটফেস্টের আলোচনায় বলেছিলেন, ‘আরব বসন্ত’ ছিল একটা চক্রান্ত। আমরা পূর্ব ইউরোপে রাশিয়াবিরোধী ভেলভেট বিপ্লব দেখেছি, যার ফজিলতে মার্কিনপন্থী দলগুলো ক্ষমতাসীন হয়। তরুণদের জনপ্রিয় আন্দোলন ছিনতাই হয়ে যাওয়ার ঘটনা মিসরে তো বটেই বাংলাদেশেও বিরল না। সত্যিকার বিক্ষোভকে সামাজিক মাধ্যমের কারিগরি এবং অর্থপুষ্ট প্রশিক্ষিত মাঠকর্মী দিয়ে বদলে ফেলা আজকের দুনিয়ায় খুবই সম্ভব। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ও সে রকমই এক ঘটনা।

ইরানের যে সব শহরে বিক্ষোভ ঘটতে দেখা গেছে। গ্রাফিকস: এএফপি
ইরানের যে সব শহরে বিক্ষোভ ঘটতে দেখা গেছে। গ্রাফিকস: এএফপি
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভ ও বিদেশি ইন্ধনের সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরানের ক্ষমতাসীনদের নিজস্ব দ্বন্দ্ব। হাসান রুহানির আচরণও জটিল। তিনি দেশি-বিদেশি প্রতিপক্ষের নিন্দা করলেও বিক্ষোভকারীদের একপ্রকার সমর্থনই করে বলেছেন, ‘প্রতিবাদের অধিকার জনগণের আছে…জনগণের অন্যতম দাবি হলো, আরও মুক্ত পরিবেশ। ধারণা করা হচ্ছে, রুহানি এই বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ক্ষমতা-কাঠামোকে দুর্বল করতে চাইছেন। কট্টরপন্থীরাও চেষ্টা করছে বিক্ষোভকে তাঁর বিরুদ্ধে চালিয়ে নিয়ে রুহানির উদার নীতির ইতি ঘটাতে। তার কিছু আলামতও দেখা যাচ্ছে। বিক্ষোভের খবর প্রথম প্রকাশ করে ইরানের সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা। এখন পর্যন্ত সরকারি ও আধা সরকারি পত্রিকা ও টিভিগুলোই এর প্রচারক।

দেশটিতে নির্বাচিত বনাম অনির্বাচিত নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এদিকে সর্বোচ্চ নেতা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন, তাঁর পদ নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক।

কিন্তু কী ঘটবে শেষে? সরকার বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এ ধরনের বিক্ষোভ দিয়ে হওয়ার না। কিন্তু রাষ্ট্রটি একটা ঝাঁকুনি খেল। হয় রুহানির নেতৃত্বে মধ্যপন্থীরা জনবিক্ষোভের দাবির কথা বলে নিজেদের আরও সংহত করবেন; নয়তো মার্কিন-ইসরায়েলের নতুন নকশা বুঝে নিজেদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে আরও ঐক্যবদ্ধ হবেন।

আন্তর্জাতিকভাবেও ইরান বড় অসুবিধায় পড়েনি। ইরানের পরিস্থিতি পশ্চিমাদের হতাশ করবে বলে চীনের পিপলস ডেইলির লেখক আঙ্কল ডাও বলেছেন, বিপ্লব তো দূরের কথা, এটা এমনকি আন্দোলনও নয়। এটা হলো জনগণের কিছু অংশের হতাশার প্রকাশ।

মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী বিক্ষোভের জোয়ারে চেপে কট্টরপন্থীদের ক্ষমতা আলগা করতে পারবেন কি? ছবি: রয়টার্স
মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বিক্ষোভের জোয়ারে চেপে কট্টরপন্থীদের ক্ষমতা আলগা করতে পারবেন কি? ছবি: রয়টার্স
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিফোন করে সমর্থন জানিয়েছেন। সম্ভবত তুরস্ক ইরানকে গোয়েন্দা ক্ষেত্রে সাহায্য করছে। ২০১৬ সালে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টার সময় ইরান ঠিক যা করেছিল, তুরস্ক এখন তার প্রতিদান দিচ্ছে। চীন-রাশিয়া-তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরানের মৈত্রীও ইরানকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করবে।

তবে এ ঘটনার শিক্ষাটা আমাদের মতো সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কেবল আধিপত্যবাদী পরাশক্তির জন্যই ভুগি না, আমাদের শাসকদের স্বৈরাচার, দুর্নীতি এবং অপদার্থতার জন্যও ভুগি। গণতান্ত্রিক ও জনদরদি শাসক ছাড়া বিদেশি আধিপত্য মোকাবিলা করা যে যায় না, তা সাদ্দাম হোসেন এবং সিরিয়ার বাশার আল–আসাদকে দিয়েও বোঝা যায়। বিকাশমান দুর্বল জাতির প্রধান সম্পদ হলো ঐক্য ও ন্যায়। জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ, ধর্মবাদ কিংবা উন্নয়নবাদ; যা-ই বলি না কেন, দিনের শেষে মানুষ সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি ও গণতন্ত্র চায়। অবশ্যই দুনিয়ার সব দেশ পশ্চিমা মডেলে ও তাদের সার্টিফিকেটে চলবে না, কিন্তু নিজের মাটি ও মানুষের স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে।

ইরান সামলে উঠবে, তবে বিশ্বের দৃষ্টি জেরুজালেম থেকে তেহরানে তো সরানো গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও কূটনৈতিক বিপর্যয়ের বাষ্প থেকে কিছুটা বেরোতে পারলেন। কিন্তু মনে রাখা চায় ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের তিনটি কৌশলের কথা: ১. আগ্রাসন (বলকান যুদ্ধ, ইরাক, আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে), ২. ছদ্ম বিপ্লব (পূর্ব ইউরোপের ভেলভেট বিপ্লব, আরব বসন্ত বা জাগরণ), ৩. ক্যু, ঘেরাও, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র (তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থান, কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা, ভেনেজুয়েলায় অবরোধ এবং পাকিস্তান ও ব্রাজিলে আদালত দ্বারা সংঘটিত ক্যু)।

ইরানকে একে একে এর সব কটিই মোকাবিলা করতে হতে পারে। ইরান সিরিয়া হবে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দাম তার শুধতে হবে। আঞ্চলিক নেতা হতে গেলে উন্নত অর্থনীতি এবং জোরদার গণতন্ত্র ছাড়া হবে না। ইরানের বিক্ষোভ দেশটির ইতিবাচক পরিবর্তনে গতি আনতে পারলেই সার্থক হবে।

ফারুক ওয়াসিফ : লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

এই খবর গুলিও পড়তে পারেন